কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা: যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিপদ।
বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে যেখানে শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব রয়েছে, সেখানে প্রায়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা দেখা যায়।
এমন হস্তক্ষেপের ফলস্বরূপ অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে, যা একটি দেশের নাগরিকদের জীবনযাত্রার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক বা ফেডারেল রিজার্ভের উপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) হলো দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর প্রধান কাজ হলো মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণ করা, যেমন—সুদের হার নির্ধারণ করা এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
ফেডের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়, যাতে রাজনৈতিক চাপ বা সরকারের ইচ্ছানুযায়ী তারা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য না হয়। কিন্তু সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফেডারেল রিজার্ভের নীতিমালার উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তিনি সুদের হার কমানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন এবং এমনকি ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তাদের অপসারণের চেষ্টা করছেন, যা নজিরবিহীন।
যদি ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভের উপর তার প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন, তাহলে এর সম্ভাব্য ফল হতে পারে ভয়াবহ। সুদের হার কমানো হলে স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি কুফল হলো মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি।
এর ফলে বাজারের অস্থিরতা বাড়বে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করবে। এর একটি বড় উদাহরণ হলো তুরস্কের অভিজ্ঞতা।
তুরস্কে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা খর্ব করে সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যার ফলস্বরূপ দেশটির অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা অবমূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক সংকট—এগুলো ছিল এর প্রধান ফল।
এক সময় তুরস্কের মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৮৫ শতাংশের উপরে চলে গিয়েছিল, যা দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। বর্তমানে, তুরস্কের মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলেও, সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মান এখনো অনেক নিচে।
আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতাও একই রকম। সেখানেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায়ই সরকারের আর্থিক চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়েছে।
এর ফলস্বরূপ, দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করে, যা এক সময় প্রায় ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা হলে, এর প্রভাব শুধু দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এর কারণ হলো, মার্কিন ডলার বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি ডলার দুর্বল হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে পণ্যের দাম বাড়বে, যা আমদানি-নির্ভর দেশগুলোর জন্য মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হবে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে, কারণ আমাদের আমদানি খরচ বেড়ে যাবে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
অতএব, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে যদি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার কার্যকারিতা হারাতে শুরু করে, তাহলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও একটি অশনি সংকেত হবে।
এই পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার নীতিনির্ধারকদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, যাতে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, যা বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে।
তথ্য সূত্র: সিএনএন।