ইন্টারনেটে বয়স যাচাই: শিশুদের সুরক্ষা নাকি মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব?
বর্তমানে অনলাইন জগতে বয়স যাচাই করার প্রবণতা বাড়ছে, বিশেষ করে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর কন্টেন্ট থেকে তাদের দূরে রাখতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে বিভিন্ন দেশে, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশে এখন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হলে ব্যবহারকারীর বয়স প্রমাণ করতে হয়।
আইডি কার্ড অথবা ফেস স্ক্যান-এর মাধ্যমে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তারা ১৮ বা ২১ বছরের বেশি বয়সী। কিন্তু এই পদ্ধতির ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা কমে যাচ্ছে কিনা, সেই বিষয়ে বিতর্ক চলছে।
এই ব্যবস্থার পক্ষে যারা আছেন, তারা মনে করেন, এর মাধ্যমে শিশুদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে। পর্নোগ্রাফি এবং অন্যান্য ক্ষতিকর ওয়েবসাইট থেকে তাদের দূরে রাখা যাবে।
তবে, সমালোচকরা বলছেন, এর ফলে ইন্টারনেটের নিরাপত্তা দুর্বল হবে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হবে এবং মানুষের অবাধে তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ কমে যাবে। তাদের মতে, বয়স যাচাই করার নামে আসলে সবার ওপর নজরদারি চালানো হবে, যা স্বাধীনতাকে খর্ব করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে বয়স যাচাই সংক্রান্ত আইন পাস হয়েছে, যদিও সেগুলোর অনেকগুলোই আইনি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। সম্প্রতি, দেশটির সুপ্রিম কোর্ট সামাজিক মাধ্যমে বয়স যাচাই করার একটি মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের আইন বহাল রেখেছে।
এর বাইরে, যুক্তরাজ্যে পর্নোগ্রাফি সাইটগুলোতে প্রবেশ করতে হলে বয়স যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি, রেডডিট, এক্স (সাবেক টুইটার), টেলিগ্রাম ও ব্লুস্কাই-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোও বয়স যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়াতে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
তবে, সমালোচকদের মতে, বয়স যাচাইয়ের আইন শুধুমাত্র তরুণদের জন্যই নয়, বরং ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সকলের জন্য গোপনীয়তা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ। কারণ, ১৮ বছরের কম বয়সীদের যাচাই করতে গেলে, ১৮ বছরের বেশি বয়সীদেরও একই প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হবে।
এর ফলে প্রাপ্তবয়স্কদেরও তাদের অধিকার খর্ব হতে পারে।
বয়স যাচাই করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আইডি আপলোড করা, ফেস স্ক্যান করা এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নির্ভর সিস্টেম।
তবে, প্রতিটি পদ্ধতিরই কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন, আইডি আপলোড করলে ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফেস স্ক্যান প্রযুক্তি এখনো নির্ভরযোগ্য নয় এবং অনেক সময় এটি বয়স শনাক্ত করতে ভুল করে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার কয়েক দিন আগে বা পরে বয়স যাচাই করতে গেলে জটিলতা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও, এআই প্রযুক্তি নারী, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী অথবা নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলোর ক্ষেত্রে কম নির্ভুল হতে পারে, যার ফলে তাদের অতিরিক্ত যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হতে পারে।
বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এই ধরনের যাচাইকরণ ব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য হচ্ছে, কারণ হয়তো তাদের ওপর সরকারি চাপ রয়েছে, অথবা তারা ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা দিতে চাইছে।
তবে, ছোট প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য এই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা বেশ কঠিন। যেমন, ব্লুস্কাই সম্প্রতি মিসিসিপিতে তাদের পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ সেখানকার আইন অনুসারে প্রত্যেক ব্যবহারকারীকে বয়স যাচাই করতে হতো, যা তাদের জন্য একটি বড় বাধা ছিল।
অন্যদিকে, মেটা’র (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম) মতো কিছু কোম্পানি মনে করে, বয়স যাচাই করার কাজটি অ্যাপ স্টোর প্রস্তুতকারকদের করা উচিত। কিন্তু গুগল এবং অ্যাপলের মতো কোম্পানিগুলো এই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত নয়।
তাদের মতে, এই ধরনের ব্যবস্থা ডেস্কটপ কম্পিউটার বা পরিবারের অন্যান্য ডিভাইসের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না।
বর্তমানে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো হয়তো তাদের ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাই করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি তৈরি করছে, যাতে তারা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে। ইউটিউব-এর মতো প্ল্যাটফর্ম তাদের ব্যবহারকারীদের দেখার ইতিহাসের ভিত্তিতে বয়স যাচাই করার জন্য এআই ব্যবহার করছে।
ইনস্টাগ্রামও একই ধরনের একটি সিস্টেম পরীক্ষা করছে, যা শিশুদের বয়স সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়া শনাক্ত করতে পারবে।
তবে, বয়স যাচাই করার নামে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স যাচাইয়ের নামে আসলে ইন্টারনেটের একটি বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে।
একদিকে, যারা নিজেদের পরিচয় দিতে রাজি, তারা একটি নির্দিষ্ট ধরনের ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে, যারা পরিচয় দিতে চাইছে না, তারা অন্য ধরনের ইন্টারনেটের সম্মুখীন হবে। এই বিভাজন শেষ পর্যন্ত একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
তথ্য সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস