যুক্তরাষ্ট্রের বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থা কি দুর্বল হয়ে পড়ছে? ‘ক্যাটরিনা’র অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে কি ভুল পথে হাঁটছে প্রশাসন? এমনটাই আশঙ্কা করছেন দেশটির প্রাক্তন ত্রাণকর্তারা।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত নয় যুক্তরাষ্ট্র।
২০০৫ সালের ২৯শে আগস্ট, ‘ক্যাটরিনা’ নামক ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে নিউ অরলিন্স শহরে।
প্রথমে ভারী বৃষ্টি এবং পরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় শহরটি। ঝড়ের তাণ্ডবে ভেঙে যায় জানলার কাঁচ, জলের তোড়ে ভেসে যায় সবকিছু।
শহর রক্ষার জন্য তৈরি কংক্রিটের বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় চারপাশ। এরপর দেখা যায়, পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে অসংখ্য মৃতদেহ।
ঘরবাড়িগুলো তাদের ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আর বন্যার পানি মিশে যায় বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পদার্থে। জীবন বাঁচানোর জন্য বাড়ির ছাদে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
কিন্তু সাহায্য আসতে অনেক দেরি হয়েছিল।
স্থানীয়, রাজ্য এবং ফেডারেল সরকারের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়। বাস্তুচ্যুত হয় ১০ লক্ষাধিক মানুষ।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১২৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
এই বিপর্যয়ের পর ত্রাণ কার্যক্রমেও দেখা যায় চরম অব্যবস্থা।
‘ক্যাটরিনা’র ভয়াবহতা যুক্তরাষ্ট্রের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়।
এরপর ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি (FEMA)-এর ব্যাপক সংস্কার করা হয়।
সেই সময় ব্যর্থতাগুলো কাটিয়ে উঠতে FEMA-এর নতুন নেতৃত্ব আসে এবং কংগ্রেস এজেন্সিটিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে, যাতে ভবিষ্যতে ক্যাটরিনার মতো দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
কিন্তু, প্রাক্তন FEMA কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সেই প্রচেষ্টাগুলো এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তাদের মতে, সম্প্রতি প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে FEMA ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব রাজ্যগুলোর উপর ন্যস্ত করার সিদ্ধান্তের কারণে বিপর্যয় মোকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
সিএনএন-এর সঙ্গে আলাপকালে, ‘ক্যাটরিনা’ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে FEMA-এর দায়িত্ব পালন করা পাঁচজন প্রাক্তন প্রধান, বর্তমান কর্মীদের উদ্বেগের প্রতিধ্বনি করে জানান, সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো FEMA-কে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য দুর্বল করে দিতে পারে।
এ বিষয়ে ব্রক লং, যিনি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে FEMA-এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি বলেন, “আমি সামগ্রিক সংস্কারের পক্ষে, তবে যেভাবে এটা করা হচ্ছে, তা আমার পছন্দ নয়।
FEMA-কে একটি সুস্পষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছাড়া বাতিল করা হলে, আমি তা বুঝি না।”
যদিও অনেকেই মনে করেন, এজেন্সিটির আকার কমানো যেতে পারে, তবে তাদের অনেকেই সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিবর্তনগুলো বিপর্যয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ‘ক্যাটরিনা’র অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাগুলোকে অগ্রাহ্য করছে।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে FEMA প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডিয়েন ক্রিসওয়েল সিএনএন-কে বলেন, “মনে হচ্ছে, আমরা ক্যাটরিনা থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো ভুলে গেছি এবং আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছি।”
‘ক্যাটরিনা’র পরবর্তী ব্যর্থতা:
ঘূর্ণিঝড় ‘ক্যাটরিনা’ আঘাত হানার দুই দিন পর, লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাসেল এল. অনোরে সামরিক বাহিনীর ত্রাণ কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিতে নিউ অরলিন্সে আসেন।
তিনি সেখানকার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “আমি হেলিকপ্টার থেকে নামার পর দেখলাম, হাজার হাজার মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন জানতে চাইছে, ‘আমরা কি উদ্ধার পাব? নাকি এটাই আমাদের শেষ?’।”
তিনি দেখেন, একজন নারী একটি শপিং কার্টে তার শিশুকে প্রায় কোমর পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
হাজার হাজার মানুষ খাবার, পানি এবং কোনো তথ্য ছাড়াই সেখানে আটকা পড়েছিল।
সেখানে কোনো টয়লেট বা খাবার পানির ব্যবস্থা ছিল না।
তখন অনোরে বলেছিলেন, “আমাদের দ্রুত তাদের সেখান থেকে বের করতে হবে। এটি ছিল একটি বিশাল উদ্ধার অভিযান।”
কিন্তু ফেডারেল সাহায্য আসতে কয়েক দিন লেগে যায়।
শীর্ষ FEMA কর্মকর্তারা তখনো পর্যন্ত এই সংকটের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।
তৎকালীন FEMA প্রশাসক মাইকেল ব্রাউন মিডিয়া কভারেজ সত্ত্বেও, শহরের কনভেনশন সেন্টারে হাজার হাজার মানুষ আটকা পড়েছে, তা জানতেন না বলে দাবি করেন।
এর আগে, FEMA-এর নেতৃত্বাধীন একটি সিমুলেশনে নিউ অরলিন্সে এ ধরনের সংকটের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
তা সত্ত্বেও, প্রশাসন, FEMA এবং স্থানীয় সহযোগী সংস্থাগুলো প্রস্তুতি নিতে, ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বা কার্যকরভাবে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়।
ব্রাউন মূলত ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’ এবং FEMA-এর দুর্বল নেতৃত্বকে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, খাদ্য, জল এবং জরুরি ঔষধ সরবরাহ চেয়ে পাঠানো তার অনুরোধগুলো ‘কাগজপত্রের ফাঁদে’ আটকে ছিল।
ঘটনার তিন সপ্তাহ পর, প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ স্বীকার করেন, “সরকারের প্রতিটি স্তরে সমন্বয়হীনতা ছিল এবং প্রথম কয়েক দিন পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।”
FEMA-এর সংস্কার:
৯/১১-এর ঘটনার পর, FEMA-কে নতুন গঠিত হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অধীনে আনা হয়।
এর ফলে এজেন্সির ক্ষমতা হ্রাস পায়, যা সিনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
দুর্বল প্রস্তুতি, অভিজ্ঞ নেতৃত্বের অভাব, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে বিপর্যয় ‘প্রায় অনিবার্য’ হয়ে ওঠে।
কিছু লোক FEMA-কে মেরামতের অযোগ্য মনে করে এটি ভেঙে দেওয়ার পক্ষে মত দেয়।
তবে আইনপ্রণেতারা এটিকে শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেন।
২০০৬ সালে, কংগ্রেস পোস্ট-ক্যাটরিনা ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট রিফর্ম অ্যাক্ট (PKEMRA) পাস করে, যা FEMA-এর সংস্কার করে এবং এটিকে নতুন স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে।
ব্রাউনের অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে, PKEMRA-এর মাধ্যমে FEMA প্রশাসকের জরুরি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জ্ঞান থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়।
এই পদটিকে আরও ক্ষমতা দেওয়া হয়।
ভবিষ্যতে FEMA পরিচালকরা দুর্যোগের সময় প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রায়ই তাদের পাশে থাকতেন।
ব্রাউন পদত্যাগ করেন এবং বুশ তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ইউএস ফায়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রধান, পেশাদার অগ্নিনির্বাপক কর্মী আর. ডেভিড পলিসনকে নিয়োগ দেন।
পলিসন সিএনএন-কে বলেন, তার প্রথম পদক্ষেপ ছিল ‘অফিস পরিষ্কার করা’।
তিনি রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের সরিয়ে আরও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সেখানে বসান।
তিনি আরও বলেন, “আমার এমন লোক দরকার ছিল যারা দুর্যোগ সম্পর্কে বোঝে।
সেখানে থাকা লোকেরা বুঝতেন না কী করতে হবে এবং কত দ্রুত করতে হবে।”
পলিসন জানান, কর্মীদের মনোবল তলানিতে ছিল।
তাই তিনি FEMA কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের আশ্বস্ত করেন যে এজেন্সি নতুন পথে হাঁটছে।
তিনি কর্মী নিয়োগ বাড়িয়ে FEMA-এর আঞ্চলিক নেতৃত্বকে শক্তিশালী করেন, যা তাদের স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে সহায়তা করে।
সংস্কারগুলি FEMA-এর অভ্যন্তরে একটি সংস্কৃতি পরিবর্তন ঘটায়।
এর ফলে এজেন্সিটি কোনো কাজ কম করার পরিবর্তে বেশি করার দিকে মনোযোগ দেয়।
এই পরিবর্তনগুলো FEMA-র ডিএনএ-এর অংশ হয়ে যায়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল দুর্যোগের আগেই ত্রাণ তহবিলে প্রবেশাধিকার পাওয়া।
এর ফলে FEMA-কে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলসহ বিভিন্ন সম্পদ আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে সহায়তা করে, যাতে ঝড়ের ১২ ঘণ্টার মধ্যে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে।
বারাক ওবামার আমলে FEMA-এর নেতৃত্ব দেওয়া ক্রেইগ ফিউগেট বলেন, “আমি জানি না আমরা কত জীবন বাঁচাতে পেরেছি, তবে আমি জানি, সক্রিয় হওয়ার অর্থ হল আমরা দ্রুত সেখানে পৌঁছেছি।”
কিন্তু এখন ফিউগেট এবং পলিসনসহ অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই অগ্রগতিগুলো আবার পিছিয়ে যাচ্ছে।
পলিসন বলেন, “আমি আশা করি, FEMA-কে পুনর্গঠনের জন্য একটি পরিকল্পনা নেওয়া হবে, যাতে এটি আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।
আমি শুধু চাই, আমরা ক্যাটরিনার আগের অবস্থায় ফিরে না যাই।”
প্রেসিডেন্টের মত পরিবর্তন:
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে, উত্তর ক্যারোলিনার অ্যাশেভিলে ঘূর্ণিঝড় হেলেনের ধ্বংসযজ্ঞ পরিদর্শনে যান।
সেখানে তিনি FEMA বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, “আমার মনে হয় আমরা FEMA-কে সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করব।
আমার মনে হয় FEMA ভালো নয়।”
নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প FEMA-কে আক্রমণ করে এর বিরুদ্ধে সাহায্য বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ আনেন।
তিনি দাবি করেন, হেলেনের সময়কার ত্রাণ কার্যক্রম ‘ক্যাটরিনার চেয়েও খারাপ’ ছিল।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য তার প্রথম মেয়াদের থেকে ভিন্ন ছিল, যখন তিনি FEMA-কে কোভিড-১৯ মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দিয়েছিলেন।
ট্রাম্পের সেই সময়ের FEMA প্রশাসক, পেট গায়নার সিএনএন-কে জানান, ট্রাম্প তাকে একটি স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন, “শোনো, মানুষ নিয়ে চিন্তা করো না, কর্তৃত্ব নিয়ে চিন্তা করো না, টাকা নিয়েও চিন্তা করো না।
শুধু কাজটি করো।”
FEMA মহামারীর সময় সরবরাহ ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
গায়ের বলেন, তার এবং ট্রাম্পের মধ্যে ‘অসাধারণ’ সম্পর্ক ছিল এবং প্রেসিডেন্ট ‘FEMA এবং এর কর্মীদের দেওয়া গুরুত্ব’ বুঝতেন।
সুতরাং, যখন ট্রাম্প FEMA-কে বিলুপ্ত করার আহ্বান জানান, তখন গায়নার বিস্মিত হন।
তিনি বলেন, “FEMA সম্পর্কে তার ধারণা যে এমন ছিল, তা আমার মনে হয়নি।
চার বছর পর FEMA সম্পর্কে তার ধারণার পরিবর্তন হলো কেন?”
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টিন নোয়েম, যিনি FEMA-এর তত্ত্বাবধান করেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের সুযোগ নিয়ে FEMAকে দুর্বল করার জন্য কাজ শুরু করেন।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা FEMA-কে পক্ষপাতদুষ্ট, অকার্যকর এবং অতিরিক্ত কর্মী সমৃদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন।
তারা যুক্তি দেখান, ফেডারেল সরকারের শুধুমাত্র চরম দুর্যোগে হস্তক্ষেপ করা উচিত এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব রাজ্যগুলোর কাঁধে নেওয়া উচিত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে FEMA-এর কার্যকারিতা হ্রাস, অভিজ্ঞতা কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অতীতের ভুলগুলো আবারও করতে পারে।
গায়ের বলেন, “আপনি যে মূল্য দেবেন, হয়তো সেই মূল্য মাইকেল ব্রাউন এবং বুশ প্রশাসন ক্যাটরিনার পরে দিয়েছিল।
যদি আমরা অতীতের ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি করি, তাহলে আমরা খুব বেশি শিখিনি।”
তথ্যসূত্র: সিএনএন