ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিথ্যা ভাষণ: এক সপ্তাহে ১০টি ভিত্তিহীন দাবির পর্দা ফাঁস। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়শই একই ধরনের মিথ্যা তথ্য দেন।
তার এই মিথ্যা বলার প্রবণতা অনেক দিন ধরেই সমালোচিত হচ্ছে, কারণ তিনি এমন সব ভিত্তিহীন কথা বলেন যা সহজেই মিথ্যা প্রমাণ করা যায়।
অনেকবার মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পরও তিনি একই কথাগুলো বলতে থাকেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ধরনের অনড় মনোভাবের কারণ হলো, তিনি সম্ভবত এমন কিছু কথা নিয়মিত বলেন যা অনেক আমেরিকান ইতিমধ্যেই মিথ্যা হিসেবে জানেন।
তবে, এর মাধ্যমে তিনি একটা সুবিধা পান। কারণ, সংবাদ মাধ্যমগুলো সাধারণত নতুন তথ্যের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়।
ট্রাম্প যখন কোনো মিথ্যা কথা প্রথমবার বলেন, তখন হয়তো কোনো সংবাদ মাধ্যম সেটির সত্যতা যাচাই করে, কিন্তু দশম বা শততম বারে এসে সেই যাচাই-এর কাজটি সেভাবে করা হয় না।
ফলস্বরূপ, ট্রাম্প তার পুরনো মিথ্যা কথাগুলোই বারবার বলতে থাকেন এবং সেগুলোর তেমন কোনো প্রতিবাদ হয় না।
গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যে পুরনো অনেক মিথ্যা তথ্য আবার শোনা গেছে।
জনগণের সুবিধার জন্য, আসুন তার বলা এমন ১০টি মিথ্যা তথ্যের বিষয়ে জানা যাক যা এরই মধ্যে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
১. গ্যাসের দাম: ট্রাম্প প্রায়ই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম ২ ডলারের নিচে।
তিনি একবার বলেছিলেন, “কিছু জায়গায় গ্যাসের দাম ২ ডলারের নিচে, এমনকি দক্ষিণেও কিছু জায়গায় ২ ডলারের নিচে।”
কিন্তু এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যে মঙ্গলবার (যেদিন ট্রাম্প এই কথা বলেছিলেন) গ্যাসের গড় দাম ছিল ২.৬৯ ডলারের বেশি।
এমনকি গ্যাস সরবরাহকারী একটি সংস্থা তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছিল, তারা দেশটির কোনো স্টেশনেই ২ ডলার বা তার কম দামে গ্যাস বিক্রি হতে দেখেনি (অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় থাকে)।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের গড় গ্যাসের দাম ছিল ৩.১৯ ডলার।
২. ওষুধের দাম কমানো: ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ওষুধের দাম ১,২০০ থেকে ১,৫০০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছেন।
সিএনএন সহ অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম এই দাবির তীব্র সমালোচনা করে, কারণ, এটি শুধু ভুলই নয়, বরং গণিতের হিসাবেও অসম্ভব।
যদি ওষুধের দাম ১০০ শতাংশ কমানো হতো, তাহলে ওষুধ বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, আর ১,২০০ শতাংশ কমালে তো রোগীদের টাকা পাওয়ার কথা!
ট্রাম্প অবশ্য এই ভুল সংখ্যাগুলো ব্যবহার করা বন্ধ করেননি।
তিনি এখনো বলছেন, “আমি ওষুধের দাম ১,৪০০ থেকে ১,৫০০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে যাচ্ছি।”
৩. মূল্যস্ফীতি নেই?: যদিও যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান, ট্রাম্প প্রায়ই বলেন, “কোনো মূল্যস্ফীতি নেই।”
সরকারি তথ্য বলছে, জুলাই মাসে জিনিসপত্রের দাম আগের বছরের তুলনায় ২.৭ শতাংশ এবং জুনের তুলনায় ০.২ শতাংশ বেড়েছে।
৪. যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও কি মেইল-ইন ভোটিং হয় না?: ট্রাম্প প্রায়ই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যেখানে মেইল-ইন ভোটের প্রচলন রয়েছে।
যদিও এটা সম্পূর্ণ ভুল।
সিএনএন এবং অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম বহুবার প্রমাণ করেছে যে, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ডসহ বিশ্বের অনেক দেশেই মেইল-ইন ভোটের প্রচলন রয়েছে।
৫. লস অ্যাঞ্জেলেসে পানি সরবরাহ: ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি একটি “ভালভ” ঘুরিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে পানি সরবরাহ করেছেন।
তবে এই দাবিও মিথ্যা।
ক্যালিফোর্নিয়ার পানি নীতি বিশেষজ্ঞরা বহু মাস ধরে বলছেন, রাজ্যে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো একক “ভালভ” নেই।
ট্রাম্প যা করেছিলেন, তা হলো রাজ্যের সেন্ট্রাল ভ্যালির দুটি বাঁধ থেকে কয়েক বিলিয়ন গ্যালন পানি সরিয়েছিলেন, যা লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্রায় ১০০ মাইলেরও বেশি উত্তরে অবস্থিত।
৬. ২০২০ সালের নির্বাচন: ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্প এখনো সেই নির্বাচন নিয়ে মিথ্যাচার করেন।
তিনি প্রায়ই বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে “জাল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা ব্যক্তি” হিসেবে উল্লেখ করেন।
৭. স্মৃতিস্তম্ভ আইন: ট্রাম্প ২০২০ সাল থেকে বলে আসছেন, তিনি একটি “আইন” স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে স্মৃতিস্তম্ভের ক্ষতি করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড হবে।
কিন্তু এটাও মিথ্যা।
ট্রাম্প আসলে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন, যেখানে স্মৃতিস্তম্ভের ক্ষতিসাধনকারীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান ফেডারেল আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
৮. ইউক্রেনকে দেওয়া সাহায্যের পরিমাণ: ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে যুদ্ধের জন্য “350 বিলিয়ন ডলার” সাহায্য দিয়েছে।
তবে এই সংখ্যাটি অনেক বেশি।
জার্মানির একটি গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১৩৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে।
৯. বাইডেন ও দক্ষিণ কোরিয়া: ট্রাম্প প্রায়ই বলেন, বাইডেন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়ের অংশীদারিত্ব বাতিল করেছেন।
কিন্তু তথ্য বলছে, বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যেখানে তারা সামরিক খাতে ব্যয় বাড়াতে রাজি হয়েছে।
১০. মেরিল্যান্ডের গভর্নরের মিথ্যা প্রশংসা: ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, মেরিল্যান্ডের গভর্নর ওয়েস মুর তাকে বলেছিলেন, “স্যার, আপনি আমার জীবনের সেরা প্রেসিডেন্ট।”
কিন্তু পরে জানা যায়, একটি টিভি চ্যানেলে কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছিল, যেখানে গভর্নর এমন কোনো কথা বলেননি।
এসব মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে ট্রাম্প সম্ভবত জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে চান।
তথ্য সূত্র: সিএনএন